ঢাকা , শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ , ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোংলা বন্দরের সড়কে কোটি টাকার সংস্কারের পরও গ'র্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৮-২৮ ১৫:৪৫:০১
মোংলা বন্দরের সড়কে কোটি টাকার সংস্কারের পরও গ'র্ত মোংলা বন্দরের সড়কে কোটি টাকার সংস্কারের পরও গর্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের প্রধান প্রবেশ সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংস্কারের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই আবারও বেহাল হয়ে পড়েছে। প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা সড়কের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ। কোথাও উঠে গেছে পিচ, কোথাও ডেবে গেছে সড়কের অংশবিশেষ। সামান্য বৃষ্টি হলেই এসব গর্তে পানি জমে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

 

ফলে প্রতিদিন চরম দুর্ভোগে পড়ছেন যাত্রী, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকসহ শত শত ভারী পণ্যবাহী ট্রাকের চালক। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।

 

মাত্র ছয় মাসের মধ্যে কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর সড়কের এমন বেহাল দশা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কাজের গুণগত মান, নির্মাণ পরিকল্পনা, প্রকৌশল তদারকি ও কাজ গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন- ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা সড়ক যদি ছয় মাসও টেকসই না হয়, তাহলে কাজের মান যাচাই হলো কীভাবে? কার তদারকিতে কাজটি হয়েছে? আর কাজ শেষ হওয়ার পর কোন প্রক্রিয়ায় তা গ্রহণ করা হয়েছিল?

 

মোংলা থেকে দিগরাজ পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের বন্দর এলাকা থেকে নৌবাহিনী স্কুল পর্যন্ত অংশটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও আবার সড়কের উপরিভাগ ভেঙে গেছে। বৃষ্টির সময় গর্তগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

 

কার্যাদেশের তথ্য অনুযায়ী, মেসার্স খন্দকার সাইন আহম্মেদ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়কটির সংস্কারকাজ করেছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা তবে কাজ শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সংস্কার কাজের স্থায়িত্ব, গুণগত মান এবং তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

 

তাদের অভিযোগ, প্রতি বছরই সড়কটি সংস্কার করা হয়। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই আবার আগের মতো গর্ত-খানাখন্দ দেখা দেয়। এতে একদিকে সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে সড়ক ব্যবহারকারীদের দুর্ভোগও কমছে না।

 

ট্রাকচালক মো. খলিল বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে গাড়ির যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৃষ্টি হলে গর্তে পানি জমে যায়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।

 

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. পলাশ শেখ বলেন, প্রতিবছর সড়কটি সংস্কার করা হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই আবার নষ্ট হয়ে যায়। তারা সাময়িক সংস্কারের পরিবর্তে স্থায়ী সমাধান চান।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, মোংলা বন্দরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ভারী পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। এ ধরনের যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে টেকসইভাবে সড়ক নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে বারবার সংস্কার করেও সুফল পাওয়া যাবে না।

 

তাদের প্রশ্ন, ভারী যানবাহনের চাপ যেখানে নিয়মিত, সেখানে সেই চাপ বিবেচনায় নিয়ে সড়ক সংস্কারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না। আর বৃষ্টির পানি জমে যদি সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়নি কেন?

 

সড়কটির সংস্কার কাজের কার্যাদেশ, কাজ শুরুর ও শেষের তারিখ, চুক্তির সময়সীমা, কাজ গ্রহণের তারিখ, গুণগত মান পরীক্ষা ও তদারকি, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়েছে কি না, তদন্ত হয়েছে কি না এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশের মেরামতের ব্যয় কে বহন করবে—এসব বিষয়ে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল অ্যান্ড হাইড্রোলিক) ও অতিরিক্ত সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) শেখ শওকত আলীর কাছে জানতে চাওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন তৈরি পর্যন্ত এসব বিষয়ে তিনি কোনো লিখিত জবাব দেননি।

 

পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে শেখ শওকত আলী বলেন, বর্তমানে সড়কটিতে রি-সলিংয়ের কাজ চলছে। সড়কের দুই পাশে ড্রেজিংয়ের বালু ফেলায় সড়কের উচ্চতা তুলনামূলক নিচু হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি জমে দ্রুত সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বড় এ প্রকল্প মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এজন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং সওজের ছয় লেন প্রকল্পের সঙ্গে সড়কটির উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।

 

শেখ শওকত আলী বলেন, দিগরাজ থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত সড়কটি বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব জমির ওপর অবস্থিত। বন্দর কার্যক্রম সচল রাখতে সড়কটি নিরাপদ ও চলাচল উপযোগী রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সংস্কারকাজের সময়সীমা, কাজ গ্রহণ, মান পরীক্ষা ও তদারকি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ, তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশের মেরামতের ব্যয়সংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর কোনো তথ্য তিনি দেননি।

 

সংস্কারকাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খন্দকার সাইন আহম্মেদের প্রতিনিধির সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন তৈরি পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ফলে সড়কটির সংস্কারকাজের মান নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

 

স্থানীয়দের দাবি, বারবার সাময়িক সংস্কার না করে এবার সড়কটির ক্ষতির প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সংস্কারকাজের গুণগত মান যাচাই, কাজের নথিপত্র পর্যালোচনা এবং প্রকৌশল তদারকির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে।

 

তাদের মতে, ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর সড়ক যদি মাত্র ছয় মাসের মধ্যে আবারও বড় বড় গর্তে পরিণত হয়, তাহলে এর পেছনে কী কারণ রয়েছে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।

 

কাজে কোনো অনিয়ম, গাফিলতি বা কারিগরি ত্রুটি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

 

এলাকাবাসীর ভাষায়, জনগণের অর্থে বারবার পিচ ঢেলে সাময়িক সংস্কার নয়—আগে বের করতে হবে সড়কটি কেন নষ্ট হচ্ছে, কাজের মান ঠিক ছিল কি না এবং তদারকিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না।

 

মোংলা বন্দরের কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি নিরাপদ ও টেকসই করতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংস্কারকাজের গুণগত মান ও তদারকির বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

 

 

 



নিউজটি আপডেট করেছেন : News Room 3

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ